দ্বীনদার পাত্র ছাড়া বিয়ে নয়—ইসলাম কী বলে?
আমি ১৯ বছর বয়সী। আমার পরিবার আমাকে বিয়ে দিতে চাইছে, কিন্তু আমি কিছু শর্তে অনড়। আমি শর্ত হিসাবে বলেছি যে,আমি বিয়ের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র তার সামনে-ই যাব—যে ছেলে ফরজ বিধান মানে, হারাম থেকে বিরত থাকে ও বিদাতের ব্যপারে কঠোর অবস্থানে থাকে।
প্রবাসী ছেলে দ্বীনদার হলেও আমি এক কথায় বিয়ে করব না বলি কোনো প্রবাসী ছেলেকে। কারন আমি চাই ভবিষ্যতে আমার সন্তানকে পরিপূর্ণ দ্বীনি পরিবেশে গড়ে তুলতে। এজন্য স্বামীর দেশে পাশে থাকা আমার জন্য জরুরি মনে করি।
আমার উদ্দেশ্য হলো—দ্বীন রক্ষা করা এবং সন্তানকে খাঁটি মুসলিম, সাহসী ও দ্বীনদার হিসেবে গড়ে তোলা। একই সাথে আমি চাই আমার মেয়ে বাহিরের কোনো পরিবেশে (স্কুল/মাদরাসা) না গিয়ে খাস পর্দাই ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় ইলম অর্জন করুক।
আমার চিন্তা-ভাবনা আছে যে—যদি উপযুক্ত কাউকে না পাই, বিয়ে থেকে বিরত থাকব।
কিন্তু আমার আমল ও আখলাক প্রচুর ঘাটতি রয়েছে।
আমার প্রশ্নগুলো—
১) আমার চিন্তা ও শর্তগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে কতটুকু সঠিক?
২) উপযুক্ত দ্বীনদার সঙ্গী না পেলে বিয়ে বিলম্ব করা বা বিয়ে থেকে বিরত থাকা ঠিক কি?
৩) ভবিষ্যৎ সন্তানের, বিশেষ করে মেয়ে সন্তানের, গড়ার পরিকল্পনা সঠিক কি?
৪) আমার আমল ও আখলাক ঠিক করার জন্য কিছু নসিহা চাই।
আরেকটি বিষয়—আমি যে শর্ত অনুযায়ী প্রস্তাব ফিরিয়ে দিই, এতে আমার পরিবার খুব টেনশন ও হতাশ হয়ে পড়ে।উনারা বলেন যে বয়স বেড়ে গেলে আর ভালো প্রস্তাব আসবে না।এতে ভবিষ্যতে সমস্যাই পড়তে পারি, এই বিষয়ে পরামর্শ চাইবো….
উত্তর
و علَيْــــــــــــــــــــكُم السلام ورحمة الله وبركاته
بسم الله الرحمن الرحيم
حَامِدًا وَّمُصَلِّيََا وَّمُسَلِّمًا أمّٰا بَعَد
প্রিয় বোন, আল্লাহ তোমার নিয়তকে কবুল করুন। তোমার প্রশ্নগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ, পরিণত ও আখিরাতমুখী। আমি কুরআন–হাদিসের আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর দিচ্ছি—সহজ ও বাস্তবভাবে।
১নং ) তোমার চিন্তা ও শর্তগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে কতটুকু সঠিক?
✅ মূল চিন্তা—দ্বীন রক্ষা করা—এটা সম্পূর্ণ সঠিক
রাসূল ﷺ বলেছেন— حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ سَابُورَ الرَّقِّيُّ حَدَّثَنَا عَبْدُ الْحَمِيدِ بْنُ سُلَيْمَانَ الْأَنْصَارِيُّ أَخُو فُلَيْحٍ عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ عَجْلَانَ عَنْ ابْنِ وَثِيمَةَ النَّصْرِيِّ عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوهُ إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ ।
“যার দ্বীন ও চরিত্রে তোমরা সন্তুষ্ট হও, তার সাথে বিবাহ দাও।” —(তিরমিজি, হাসান ১৯৬৭)
তুমি যে শর্তগুলো বলেছ:
ফরজ মানে
হারাম থেকে বাঁচে
বিদআতের ব্যাপারে সতর্ক
এগুলো ইসলামের মৌলিক ও শরঈ শর্ত। এগুলোতে অনড় থাকা গুনাহ নয়, বরং প্রশংসনীয়।
❗ তবে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে দ্বীনদার বলতে ফেরেশতা নয়,
বরং— নিয়মিত ফরজ আদায় করে
হারাম থেকে বাঁচার চেষ্টা করে
ভুল হলে তওবা করে
এই স্তরটাই শরিয়তে গ্রহণযোগ্য।
অতিরিক্ত আদর্শ খুঁজতে গিয়ে যেন বাস্তবযোগ্য দ্বীনদারকেও বাতিল না করা হয়—এখানে ভারসাম্য জরুরি।
২নং) উপযুক্ত দ্বীনদার সঙ্গী না পেলে বিয়ে বিলম্ব করা বা বিরত থাকা কি ঠিক?
📌 হুকুম:
বিয়ে ফরজ নয়, যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে, এমন অবস্থায় বিয়ে বিলম্ব করা জায়েজ।
আল্লাহ বলেন— وَلۡیَسۡتَعۡفِفِ الَّذِیۡنَ لَا یَجِدُوۡنَ نِکَاحًا حَتّٰی یُغۡنِیَہُمُ اللّٰہُ مِنۡ فَضۡلِہٖ “যার বিবাহের জন্য সামর্থ নাই, তারা যেন পবিত্রতা রক্ষা করে, যতক্ষণ না আল্লাহ তাদের স্বচ্ছল করেন।” —(সূরা নূর: ৩৩) সুতরাং উপযুক্ত দ্বীনদার না পেলে অপেক্ষা করা জায়েজ
❌ কিন্তু “কখনোই বিয়ে করব না”—এমন নিয়ত ঠিক নয় কারণ
রাসূল ﷺ বলেছেন قَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم النِّكَاحُ مِنْ سُنَّتِي فَمَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِسُنَّتِي فَلَيْسَ مِنِّي وَتَزَوَّجُوا فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمْ الْأُمَمَ وَمَنْ كَانَ ذَا طَوْلٍ فَلْيَنْكِحْ وَمَنْ لَمْ يَجِدْ فَعَلَيْهِ بِالصِّيَامِ فَإِنَّ الصَّوْمَ لَهُ وِجَاءٌ , রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেনঃ বিবাহ করা আমার সুন্নত। যে আমার সুন্নত অনুসরণ করলো না, সে আমার দলভুক্ত নয়। তোমরা বিয়ে কর; কেননা, আমি তোমাদের নিয়ে অন্যান্য উম্মতের উপর গর্ব করব। (ইবনে মাজাহ ১৮৪৬)
👉 অর্থাৎ: অপেক্ষা করো,
দোয়া করো, কিন্তু দরজা পুরো বন্ধ কোরো না।
৩নং) ভবিষ্যৎ সন্তানের (বিশেষত মেয়ে সন্তানের) পরিকল্পনা কি সঠিক?
🌸 নিয়ত দারুণ ও সাওয়াবের কাজ সন্তানকে দ্বীনদার বানানোর নিয়ত নিজেরই ইবাদত।
আল্লাহ বলেন— یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا قُوۡۤا اَنۡفُسَکُمۡ وَاَہۡلِیۡکُمۡ نَارًا“হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর।”—(সূরা তাহরীম: ৬)
⚖ তবে বাস্তবতার দিকটি জরুরি
ঘরে দ্বীনি পরিবেশ দেওয়া খুবই ভালো, পর্দা বজায় রেখে ইলম শেখানো উত্তম, কিন্তু মনে রাখবে: সব সময় সব পরিস্থিতি আমাদের হাতে থাকে না, কখনো বিশ্বস্ত মহিলা মাদরাসা/আলিমার কাছেও ইলম নেওয়া লাগতে পারে
📌 ইসলামে পদ্ধতির নমনীয়তা আছে, কিন্তু লক্ষ্য স্থির।
৪নং) আমল ও আখলাক ঠিক করার জন্য নসিহা🌱
৫টি বাস্তব নসিহা:
১নং ফরজে দৃঢ় হও
সময়মতো সালাত আদায় কর।
হায়া ও পর্দা রক্ষা কর।
গুনাহ থেকে বাঁচার চেষ্টা কর।
২নং কুরআনের সাথে সম্পর্ক
প্রতিদিন অন্তত ৫–১০ আয়াত, অর্থ বুঝে পড়ার চেষ্টা কর “এই কুরআনই মানুষকে সবচেয়ে সোজা পথে পরিচালিত করে।” ( সুরা ইসরা: ৯)
৩নং জিহ্বা ও আখলাক সংরক্ষণ কর
রাসূল ﷺ বলেছেন— “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে, যার আখলাক উত্তম।” —(বুখারি)।
কথা কম, নরম, ও রাগ দমন কর ।
পরিবারে আদব বজায় রাখ ।
৪নং তওবা ও দোয়া
প্রতিদিন এই দোয়া পড়ো— يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ অর্থ “হে আল্লাহ, আমার অন্তরকে হেদায়েতের ওপর দৃঢ় রাখুন।” —(তিরমিজি 2140) ।
৫ নং ভালো পরিবেশ
দ্বীনদার বোনদের সাথে সম্পর্ক রাখ।
উপকারী বয়ান শোনার চেষ্টা কর।
পরিবার নিয়ে তোমার যে দুশ্চিন্তা—
এ বিষয়ে পরামর্শ পরিবার সত্যিই তোমার মঙ্গল চায় তাদের ভয়—বয়স বাড়লে প্রস্তাব কমে যাবে সমাজ কী বলবে
➡ এগুলো বাস্তব চিন্তা,
কিন্তু রিজিক ও বিয়ে আল্লাহর হাতে। আল্লাহ বলেন— “আল্লাহ যাকে চান, তার জন্য উত্তম ব্যবস্থা করে দেন।” —(সূরা তালাক: ২–৩)
কীভাবে বলবে পরিবার কে? নরম ভাষায়, অহংকার ছাড়া বলবে: “আমি বিয়ে অস্বীকার করছি না, শুধু দ্বীনের ব্যাপারে আপস করতে চাই না।”
👉 দোয়া করতে বলো, সময় দিতে বলো। শেষ কথা (খুব গুরুত্বপূর্ণ) বোন,
✔ তোমার উদ্দেশ্য সঠিক
✔ তোমার ভয় আল্লাহভীতি থেকে
❗ কিন্তু নিজের আমল ঠিক না করে শুধু স্বামীর দ্বীন খোঁজা অসম্পূর্ণ
👉 নিজে যেই স্তরের স্বামী চাও, সেই স্তরের স্ত্রী হওয়ার চেষ্টাই সবচেয়ে শক্তিশালী
দোয়া।
আল্লাহ তোমাকে—
হিকমাহ
সবর
উত্তম জীবনসঙ্গী,দান করুন। আমিন
উত্তর প্রদানে: হা: মাও: মুফতি আবু রায়হান সিরাজী
والله اعلم بالصواب













